হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হলেও
ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদের উত্থান চলছে
হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হলেও
ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদের উত্থান চলছে
আন্দোলন প্রতিবেদন
বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ | অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনা থেকেই জনগণ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছিল। ১৯৭২ সালে মুজিব সরকার গঠনের পরই ভিন্নমত দমনে শুরু হয়েছিল ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। খুনী রক্ষিবাহিনী গঠন করে ভিন্নমতের প্রায় ২০ হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছিল। পাহাড়ি জাতিসত্তার স্বীকৃতি না দিয়ে শেখ মুজিব আদিবাসীদের বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিল। শেখ মুজিবের এই “উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী” চেতনার ভিতরই নিহিত ছিল ফ্যাসিবাদের বীজ। ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনকালে জনগণ ফ্যাসিবাদ প্রত্যক্ষ করেছে। মুজিব তার জীবনের শেষ দিকে সমস্ত বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালি শাসন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করেছিল।
২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত হাসিনার-আওয়ামী শাসনামলে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” ও “উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ”কে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ নতুনরূপে আগমন করে। একে ভিত্তি করেই আওয়ামী সরকার জনগণের উপর এবং শাসকশ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাপর অংশের উপর বর্বর দমন-নিপীড়ন চালায়। বর্তমানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্র-সমাজে তাদের ভিত্তি রয়েছে, যা নির্মূল করা শাসকশ্রেণির তৃতীয় শক্তির বর্তমান সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, তাদের শ্রেণি ও বৈদেশিক প্রভু একই, যদিও কোন প্রভুকে প্রাধান্য দেয়া হবে সেক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাও মূলত একই। ফলে ফ্যাসিবাদ এ সমাজ-ব্যবস্থা থেকে বিবিধ রূপে উত্থিত হবে এবং রয়েই যাবে।
সামনে দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদসহ ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদের বিপদ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদেরও রয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-আদর্শিক ভিত্তি। তবে ধর্মীয় চেতনা আর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ এক নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস বিভিন্ন মাত্রায় ও বিভিন্ন রূপে সাধারণ জনগণের ভেতর রয়েছে। কিন্তু ধর্মকে যখন রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ উদ্ভবের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এদের একটা অংশ ফ্যাসিস্ট বলপ্রয়োগে ভিন্নমত দমনে ধর্মকে ব্যবহার করে– যেমনটা ইরান, আফগানিস্তানে ঘটছে।
ইতিমধ্যে এমন কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা-ভাঙচুর হয়। বিভিন্ন বাউল সঙ্গীত শিল্পী, সুফীসাধকের বাড়িতে দলবদ্ধভাবে হামলা চলে। সুনামগঞ্জের একটি গ্রামে গান-বাজনা নিষিদ্ধের ফতোয়া জারি করা হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে ’৭১-এর খুনি জামাত-শিবিরসহ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করছে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার ‘পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন সমন্বয় কমিটি’ থেকে দুজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল হাসান মামুন ও সামিনা লুৎফাকে কমিটি থেকে বাদ দিয়েছে। মাজার ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে হামলার জন্য কোনো তদন্ত কমিটি করেনি, অপরাধীদের এক ধরনের দায়মুক্তি দিয়েছে। এভাবে তারা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সাথে আপস করছে।
এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকশ্রেণির বিরোধিতা করে, যা খোদ ভারতের জনগণের বিরোধিতায় পর্যবসিত হয়। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে গিয়ে কার্যত ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদেরও বৈধতা দিচ্ছে। চিন্ময় দাসের সনাতন জাগরণ মঞ্চের কার্যকলাপ ও এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী দলগুলোর জেহাদি তৎপরতা উভয়ই দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিপদের অশনি সংকেত।
কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিপদ শুধু ধর্মীয় রূপেই রয়েছে তা নয়। হাসিনার ফ্যাসিবাদই তার প্রমাণ। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর পরই শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পাঁয়তারা শুরু হলো, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধও করা হলো। এই বিরাজনীতিকরণ হলো সারমর্মে একটি ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। কারণ, এর মাধ্যমে সেনা, অ-সেনা আমলা বা সুশীলরা রাজনীতি করে চলে, কিন্তু জনগণের রাজনীতি করার অধিকার হরণ করা হয়।
তাই নিপীড়িত শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-নারী-আদিবাসী জনগণসহ সকল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বিপ্লবী শক্তিকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামকে শুধু হাসিনা-আওয়ামী বিরোধিতায় সীমিত করলে চলবে না। বরং সকল গোত্রের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হলেও
ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদের উত্থান চলছে
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনা থেকেই জনগণ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছিল। ১৯৭২ সালে মুজিব সরকার গঠনের পরই ভিন্নমত দমনে শুরু হয়েছিল ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। খুনী রক্ষিবাহিনী গঠন করে ভিন্নমতের প্রায় ২০ হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছিল। পাহাড়ি জাতিসত্তার স্বীকৃতি না দিয়ে শেখ মুজিব আদিবাসীদের বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিল। শেখ মুজিবের এই “উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী” চেতনার ভিতরই নিহিত ছিল ফ্যাসিবাদের বীজ। ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনকালে জনগণ ফ্যাসিবাদ প্রত্যক্ষ করেছে। মুজিব তার জীবনের শেষ দিকে সমস্ত বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালি শাসন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করেছিল।
২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত হাসিনার-আওয়ামী শাসনামলে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” ও “উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ”কে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ নতুনরূপে আগমন করে। একে ভিত্তি করেই আওয়ামী সরকার জনগণের উপর এবং শাসকশ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাপর অংশের উপর বর্বর দমন-নিপীড়ন চালায়। বর্তমানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্র-সমাজে তাদের ভিত্তি রয়েছে, যা নির্মূল করা শাসকশ্রেণির তৃতীয় শক্তির বর্তমান সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, তাদের শ্রেণি ও বৈদেশিক প্রভু একই, যদিও কোন প্রভুকে প্রাধান্য দেয়া হবে সেক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাও মূলত একই। ফলে ফ্যাসিবাদ এ সমাজ-ব্যবস্থা থেকে বিবিধ রূপে উত্থিত হবে এবং রয়েই যাবে।
সামনে দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদসহ ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদের বিপদ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদেরও রয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-আদর্শিক ভিত্তি। তবে ধর্মীয় চেতনা আর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ এক নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস বিভিন্ন মাত্রায় ও বিভিন্ন রূপে সাধারণ জনগণের ভেতর রয়েছে। কিন্তু ধর্মকে যখন রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ উদ্ভবের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এদের একটা অংশ ফ্যাসিস্ট বলপ্রয়োগে ভিন্নমত দমনে ধর্মকে ব্যবহার করে– যেমনটা ইরান, আফগানিস্তানে ঘটছে।
ইতিমধ্যে এমন কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা-ভাঙচুর হয়। বিভিন্ন বাউল সঙ্গীত শিল্পী, সুফীসাধকের বাড়িতে দলবদ্ধভাবে হামলা চলে। সুনামগঞ্জের একটি গ্রামে গান-বাজনা নিষিদ্ধের ফতোয়া জারি করা হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে ’৭১-এর খুনি জামাত-শিবিরসহ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করছে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার ‘পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন সমন্বয় কমিটি’ থেকে দুজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল হাসান মামুন ও সামিনা লুৎফাকে কমিটি থেকে বাদ দিয়েছে। মাজার ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে হামলার জন্য কোনো তদন্ত কমিটি করেনি, অপরাধীদের এক ধরনের দায়মুক্তি দিয়েছে। এভাবে তারা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সাথে আপস করছে।
এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকশ্রেণির বিরোধিতা করে, যা খোদ ভারতের জনগণের বিরোধিতায় পর্যবসিত হয়। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে গিয়ে কার্যত ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদেরও বৈধতা দিচ্ছে। চিন্ময় দাসের সনাতন জাগরণ মঞ্চের কার্যকলাপ ও এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী দলগুলোর জেহাদি তৎপরতা উভয়ই দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিপদের অশনি সংকেত।
কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিপদ শুধু ধর্মীয় রূপেই রয়েছে তা নয়। হাসিনার ফ্যাসিবাদই তার প্রমাণ। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর পরই শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পাঁয়তারা শুরু হলো, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধও করা হলো। এই বিরাজনীতিকরণ হলো সারমর্মে একটি ভিন্ন গোত্রের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। কারণ, এর মাধ্যমে সেনা, অ-সেনা আমলা বা সুশীলরা রাজনীতি করে চলে, কিন্তু জনগণের রাজনীতি করার অধিকার হরণ করা হয়।
তাই নিপীড়িত শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-নারী-আদিবাসী জনগণসহ সকল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বিপ্লবী শক্তিকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামকে শুধু হাসিনা-আওয়ামী বিরোধিতায় সীমিত করলে চলবে না। বরং সকল গোত্রের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র